শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:৪৩ অপরাহ্ন
জীবনে কত উত্থান-পতন আসে, ভাঙা-গড়ার গল্প নির্মাণ হয়, স্বপ্ন দেখা হয় এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কত কী করা হয়; কখনও আমার লালিত আকাঙ্খা পূর্ণতা পায়, আবার কখনও পায় না।
এভাবেই এক সময় জীবনের শেষ মুহূর্তটিও চলে আসে।
আমি মনে করি, আমার জীবনের লক্ষ্য এবং অর্থ এই বৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জীবন আমার কাছ থেকে এতটুকুই দাবি করে। মনে করি, আমাকে পৃথিবীতে প্রেরণের আর কোনো লক্ষ্য-উপলক্ষ নেই। নিজের চাওয়া-পাওয়ার বাইরে আর কোনো করণীয় নেই।
ভুলে যাই, আমার একজন প্রভু আছেন। যিনি আমাকে এত সুন্দর অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। রূহের জগৎ থেকে মাতৃগর্ভে, মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আমাকে রিজিক দিচ্ছেন। আমার চাওয়া-পাওয়াগুলো পূরণ করছেন। আমাকে সুখ দিচ্ছেন। কখনও বা আমার অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা উপলব্ধির জন্য কিছুটা দুঃখি করছেন।
আল্লাহ তায়ালা তো দুঃখ-কষ্টের বিনিময়ে আমাদেরকে জান্নাত দিবেন। নিজেদের জান-মালের বিনিময়ে তার কাছ থেকে আমরা জান্নাত খরিদ করে নিয়েছি।
ইহজাগতিক সুখ-দুঃখ সাময়িক। এক সময় তা অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে। আর জান্নাতে কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। থাকবে না কোনো অপূর্ণতা। ইচ্ছে যা হবে তাই করতে পারব। সেখানে কেবল সুখ আর সুখ। কোনো কিছু না পাওয়ার বেদনা আমাকে স্পর্শ করবে না।
আজ আমরা নিজেদের পরিচয় ভুলে গেছি। কেন আমরা পৃথিবীতে এসেছি তাও ভুলে গেছি। নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা থেকে সরে এসেছি।
যেই মহান আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তার দেয়া জীবন বিধান ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। তিনি যে পথে জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা রেখেছেন, তা গ্রহণ না করে অন্য পথে সুখ খুঁজে কেবল দুঃখ-কষ্টই কুড়িয়ে নিচ্ছি।
অথচ,ভালো কাজ করলে সেটা আমারই থাকবে এবং মন্দ কাজ করলে তার ফল আমাকেই ভোগ করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘যে সৎকর্ম করে সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দকর্ম করলে তার প্রতিফল সেই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না।’ (সূরা হা-মিম সিজদা, আয়াত: ৪৬)
‘কেউ কোনো সৎকর্ম করলে সে তার দশ গুণ পাবে এবং কেউ কোনো অসৎকাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিদান দেয়া হবে।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও সে দেখতে পাবে।’ (সূরা আজ-জিলজাল, আয়াত: ৭-৮)
পৃথিবীতে অন্যায়-অপরাধ করে, আল্লাহ নির্দেশিকাসহ পথ ছেড়ে সাময়িক নিষ্কর পেয়ে আমি ভাবছি, আমার আর বিচার হবে না; এ ধারণা ভুল। মৃত্যুর পরে জীবনের প্রতি মুহূর্তের হিসাব আমার কাছে চাওয়া হবে।
যাপিত জীবনের পূর্ণাঙ্গ কারনামা আমাকে দেখানো হবে। সেদিন সবকিছু স্পট হয়ে যাবে। মিথ্যার বলার সুযোগ থাকবে না।
আমার হাত আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। আমার পারে,আমার জিহ্বা আমার বিরুদ্ধে কথা বলবে। প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সেদিন নালিশ জানাবে।
প্রিয় পাঠক, দুনিয়ার জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। একদিন না একদিন বেলা ডুবে যাবেই। আমি ভালো কাজ করলেও আমার মৃত্যু অবধারিত। মন্দ করলেও। আমি চিন্তা করি, আমি তো এখনও যুবক, বৃদ্ধ হলে ইবাদত করব, আল্লাহমুখি হব; আমার জীবনের এতটুকু নিশ্চয়তা আমি কীসের ভিত্তিতে দিতে পারি? কে আমাকে বলে দিল বৃদ্ধ বয়স হওয়া পর্যন্ত আমি হায়াত পাব?
আজ অল্পস্বল্প আমল করে আমরা নিজেদেরকে জান্নাতি ভাবতে থাকি। অথচ, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিরাও নিজেদের আমলে সন্তুষ্ট হতেন না। সব সময় ইস্তেগফার করতেন।
আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। নবীজি (সা.) দিনে কমপক্ষে সত্তরবার আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। অথচ, পূর্বাপর তার সমস্ত ভুল-ত্রুটি আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
এবার নিজেদের আমল, ভালো কি মন্দ, মিলিয়ে দেখি। দিনে কতবার আমি ইস্তেগফার করি, একটু ভেবে দেখি।
আমার দ্বারা কি গোনাহ হয় না? আমি নিজের প্রতি জুলুম করি না? তাহলে নিজেকে কতটুকু পরিবর্তন করা উচিত, একটু ভেবে দেখি। নিজেকে বদলানোর সময় এখনই।
লেখক: মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ
তরুণ আলেম ও সংবাদকর্মী
যুগান্তর
Leave a Reply